শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯)

বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের পদার্পণ ঘটেছে নাটক রচনার মধ্য দিয়ে। বাংলায় সাহিত্য রচনার পূর্বে তিনি ইংরেজিতে ‘The Captive Ladie’ এবং ‘Visions of the Past’ রচনা করেন। তিনি কলকাতায় ফিরে আসার পর (১৮৫৮) বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনয়ের জন্য রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘রত্নাবলী’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদের প্রস্তাব পান। সেই অনুবাদ করার সময় ও নাটকের অভিনয় দেখে মধুসূদন বাংলা নাটকের অন্তঃসারশূন্যতা উপলব্ধি করেন এবং সেইক্ষণেই বাংলায় নাটক লেখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ফলে জন্ম নেয় আধুনিক পাশ্চাত্যশৈলীতে রচিত প্রথম বাংলা নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’। ১৮৫৯ সালের জানুয়ারিতে নাটকটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই বছরই ৩রা সেপ্টেম্বর নাটকটি বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনীত হয় এবং দর্শকদের কাছে বহুল প্রশংসিত হয়।

‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকটিতে পাশ্চাত্য নাট্যশৈলী প্রাধান্য পেলেও সংস্কৃত নাটকের আদর্শ সম্পূর্ণ রূপে বর্জিত হয়নি। ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক ধারার পাশাপাশি নাটকটির কাব্যময়তা, অলংকারবহুল দীর্ঘ সংলাপ, বর্ণনাত্মক রীতিতে ঘটনা বিশ্লেষণ, প্রবেশক, নটী, বিদূষক প্রভৃতির ব্যবহারে নাটকটিতে সংস্কৃত নাট্যরীতির প্রভাব স্পষ্ট হয়। নাটকটির কাহিনী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নাট্যকার মহাভারতের আদিপর্বের শর্মিষ্ঠা-দেবযানী-যযাতির উপাখ্যানকে অবলম্বন করেছেন। শর্মিষ্ঠার নির্বাসন থেকে নাটক শুরু হয়ে যযাতির জরা মুক্তিতে শেষ হয়েছে। নাট্যকার আবশ্যিকতামত মূল কাহিনীর সামান্য গ্রহণ-বর্জন করেছেন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধুসূদন পাশ্চাত্য সাহিত্যের উন্নত রুচিবোধের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তাই এই নাটকে পৌরাণিক কাহিনীকে যথাসম্ভব অবিকৃত রেখেই তাকে আধুনিক যুগের উপযোগী করে গড়ে তুলেছিলেন। নাটকের গঠন, চরিত্র-চিত্রণ, সংলাপ সৃষ্টির দিক দিয়ে ‘শর্মিষ্ঠা’ সমকালীন নাটকগুলির তুলনায় অনেকখানি পরিণত।