মধুসূদন দত্ত তাঁর প্রথম নাটক শর্মিষ্ঠার মতো পৌরাণিক কাহিনিকেই অবলম্বন করে দ্বিতীয় নাটক ‘পদ্মাবতী’ রচনা করেছিলেন, তবে সে কাহিনি ভারতীয় পুরাণের নয়। গ্রিক পুরাণের ‘অ্যাপেল অফ ডিসকর্ডের’ কাহিনিকে এখানে তিনি ভারতীয় পুরাণের মোড়কে পরিবেশন করেছেন। গ্রিক পুরাণের দেবী জুনো, প্যালাস ও ভেনাস এই নাটকে শচী, মুরজা ও রতি রূপে চিত্রিত হয়েছেন। শুধু নামেরই নয় দেবীদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যেও ভারতীয় প্রভাব রেখেছেন নাট্যকার। তাই তাঁরা ইউরোপীয় দেব-দেবীদের মতো উচ্চতর নীতিবোধের অধিকারী নন, পরিবর্তে তাঁদের মধ্যে আছে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ঈর্ষা ও ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষা। গ্রিক পুরাণের হেলেন ও প্যারিস এই নাটকে রূপান্তরিত হয়েছেন ইন্দ্রনীল ও পদ্মাবতী নামে। তিন দেবীর স্বর্ণ আপেল লাভের বাসনাকে কেন্দ্র করে নাটকের কাহিনির সূত্রপাত। নারদ ঘোষণা করেন যিনি সুন্দরীশ্রেষ্ঠা বলে বিবেচিত হবেন তিনিই এই আপেল লাভ করবেন। সুন্দরীশ্রেষ্ঠা নির্বাচনের দায়িত্ব পড়ে রাজা ইন্দ্রনীলের উপর। তিনি দেবী রতিকে শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর আখ্যা দিলে অন্য দুই দেবী তাঁর প্রতি রুষ্টা হয়ে তাঁর বিবিধ ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত হন। শেষে রতি ও ভগবতীর চেষ্টায় ইন্দ্রনীল উদ্ধার পান এবং বিচ্ছিন্ন প্রেয়সী পদ্মাবতীর সঙ্গে পুনরায় মিলিত হন। মূল গ্রিক-কাহিনিটি বিয়োগান্তক হলেও মধুসূদন এখানে পরিণতি মিলনান্তক রেখেছেন। কাহিনি-নির্মাণ, চরিত্র-চিত্রণ, নাট্যদ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে এই নাটকটি বহুলাংশে পরিণত। তবে যে কারণে এই নাটকটি সর্বাধিক উল্লেখ্য তা হল অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার। পরবর্তীকালে মধুসূদনের যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সুরঝংকারে বাংলা সাহিত্য অনুরণিত হয়েছিল সেই ছন্দের প্রথম প্রয়োগ তিনি এই নাটকেই করেছিলেন।
Posted inUncategorized